ফখরুদ্দীন-মইন ইউ কোথায় আছেন, কেমন আছেন?

আরেকটি ১/১১ চলে আসার পর আরো একবার অনেকের জানতে চাওয়া: ওই সময়ের সরকার প্রধান ফখরুদ্দীন আহমদ এবং সেনাপ্রধান হিসেবে নেপথ্যে থেকে সবকিছুর পরিচালক জেনারেল মইন ইউ আহমেদ এখন কোথায় আছেন? কেমন আছেন?

বাংলাদেশের ১/১১ নামকরণ হয়েছে পশ্চিমাদের অনুকরণে। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে যে ভয়াবহ হামলা হয়েছিল, তা ৯/১১ নামে যুক্তরাষ্ট্র তথা সারাবিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত। বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পরিস্থিতির কারণে সেনা হস্তক্ষেপকে পশ্চিমা রীতির অনুকরণে চিহ্নিত করা হয়েছে ১/১১ হিসেবে।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলমান অসহিষ্ণুতার কারণে সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম ব্যর্থতা এবং এর ফলে পশ্চিমাদের চাওয়ার ফল হিসেবে ওইদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চলে যায় সেনা সমর্থিত অরাজনৈতিক সরকারের হাতে।

এর আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে সেনাপ্রধান পদে পরিবর্তন আনতে চান ইয়াজউদ্দিন। সেনাবাহিনীর মূলধারা তার এ সিদ্ধান্ত আগেই জানতে পেরে ১১ জানুয়ারি তা বন্ধ করার পাশাপাশি জরুরি অবস্থা জারি করায়। বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত হয় নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

ইয়াজউদ্দিন অধ্যায় শেষ হলে দেশের মানুষ আশা করেছিল ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্রুততম সময়ে দেশবাসীকে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন উপহার দেবে। কিন্তু, তারা উল্টো ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন করে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে দেশের রাজনীতি থেকে বিদায়ের চেষ্টা শুরু করে বলে অনেকেই মনে করেন।

সেসময় সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। অনেকে মনে করেন, তিনি তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিস এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর অলিখিত সহযোগিতায় ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালিয়েছেন। ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ ও জরুরি অবস্থা জারির ছয় মাসের মধ্যে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোররাতে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় ৩ সেপ্টেম্বর। তবে, আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্ত হন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। অনেক শঙ্কা আর দোলাচলের পর নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালের শুরুতে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

তবে, দেশের রাজনীতিতে এখনও ‘ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিন-ইয়াজউদ্দিন’ নামগুলো একসঙ্গে আলোচিত হয়।

এক-এগারো বা ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ের রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর ৮১ বছর বয়সে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

আর ফখরুদ্দিন আহমদ এবং মইন ইউ আহমেদ এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সেসময় মঈন ইউ আহমেদকে সহযোগিতা করা একাধিক সাবেক সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার ঠিকানাও হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশ।

২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ক্ষমতার পালাবদলের পর ফখরুদ্দীন আহমদ বেশ কিছুদিন সরকারি বিশেষ নিরাপত্তায় দেশেই ছিলেন।

এরপর ১/১১ কর্মকাণ্ডের কিছু বিষয় খতিয়ে দেখতে গঠিত সংসদীয় কমিটি ফখরুদ্দীনকে জেরার জন্য তলব করছে মর্মে খবর প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যে সপরিবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। আগে থেকেই মার্কিন নাগরিক ফখরুদ্দীন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে যে দুটি বাড়ির মালিক তার একটিতে এখন তিনি স্ত্রীসহ থাকছেন। অন্য বাড়িতে থাকে তার মেয়ের পরিবার।

খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ায় ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিষয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা করছেন তিনি। তবে, স্থানীয় বাংলাদেশী কমিউনিটির একটি অংশ বিশেষ করে বিএনপি সমর্থকদের ক্ষোভের কারণে তিনি নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে রাখেন। ২০০৯ সাল থেকে সেখানে অবস্থান করলেও তিনি সাধারণত: বাংলাদেশী কমিউনিটির সামনে আসেন না বলে প্রবাসীরা দাবি করেছেন।

২০১৫ সালের শেষদিকে তার এক বন্ধুর জানাযায় অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক মসজিদে উপস্থিত হয়েছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। তবে, সেসময় বেশ কয়েকজন তার সামনেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জানাযা শেষ করে দ্রুত ওই এলাকা ছেড়ে চলে যান তিনি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও ১/১১ এর সময়ের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময়ই ঘটে আলোচিত পিলখানা হত্যাকাণ্ড।

পরে অবসর নিয়ে অনেকটা নীরবে ২০০৯ সালের জুন মাসে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। বর্তমানে নিউইয়র্কের জ্যামাইকার একটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় সাধারণ জীবনযাপন করছেন মইন ইউ আহমেদ। প্রথমে ফ্লোরিডায় ছোট ভাই ও ছেলের কাছে থাকলেও পরে ‘থ্রোট ক্যানসার’ ধরা পড়লে চিকিৎসার জন্য তিনি নিউইয়র্কে চলে যান। ক্যানসারের জন্য কেমোথেরাপি ও বোনম্যারো অস্ত্রোপচারের পর এখন অনেকটাই সুস্থ তিনি।

প্রবাসীরা জানিয়েছেন, দু’ কক্ষের একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকছেন ১/১১ এর প্রচণ্ড ক্ষমতাধর ওই জেনারেল। সর্বশেষ ২০১৬ সালের জুলাই মাসের শেষদিকে তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। ওই বিয়েতে বেশ হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় দেখা যায় তাকে। পুরোটা সময়জুড়ে সঙ্গে ছিলেন মিসেস মইন।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গেলে তিনি কিছুদিন পরই দেশে ফিরে আসবেন বলা হলেও তা আর হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে একবার শুধুমাত্র সৌদি আরবে হজ করতে গিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি দীর্ঘ সময় ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে। এ সময়ের মধ্যে ফাউন্ডেশন অব ফ্লোরিডার আয়োজনে উত্তর আমেরিকা রবীন্দ্র সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তবে তিনিও বাংলাদেশী কমিউনিটি থেকে নিজেকে একটু দূরে রাখেন।

১/১১ সময়ের বিভিন্ন ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি উঠেছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে। জাতীয় সংসদেও মন্ত্রী-সাংসদরা একই দাবি তুলেছিলেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতন ঘটনার তদন্ত

Must Like and Share 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*